সঠিক নিয়মে দাঁতের যত্ন নেবেন যেভাবে; ডাঃ সাব্বির হাসান লিখন

সোহাগ মৃধাঃ

সৌন্দর্যের অনেকটাই নির্ভর করে সুস্থ সুন্দর হাসির উপর। আর এই সুন্দর হাসির জন্য চাই নিয়মিত দাঁতের পরিচর্যা। সঠিক নিয়ম মেনে দাঁতের যত্ন নিলে দাঁত সুন্দর ও মজবুত থাকবে দীর্ঘদিন। যদি সঠিক সময়ে দাঁতের যত্ন না নেই, তাহলে দাঁতে বিভিন্ন ধরনের অসুখ দেখা দেবে। যেমন- দাঁত হলুদ হয়ে যাওয়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।
এখন জেনে নেব দাঁতের যত্নে করণীয় সম্পর্কে-
১. সুস্থ দাঁতের জন্য নিয়মিত সকালে নাস্তার পরে ও রাতে খাবারের পরে দুই বার সঠিকভাবে দুই মিনিট ধরে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। ব্রাশ করার সময় যথাসম্ভব আলতো করে সার্কুলার মোশনে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। ব্রাশটি ভালো মানের ও নরম হতে হবে। প্রতি ৩ থেকে ৫ মাস পর পর ব্রাশ পরিবর্তন করতে হবে।
২. দাঁত নিয়মিত ব্রাশ করার পাশাপাশি ফ্লস বা সুতা দিয়ে প্রতিটি দাঁতের ফাঁকের খাদ্যকণাগুলো বের করে ফেলতে হবে। তাহলে দাঁতের ফাঁকে খাদ্যকণা জমে থেকে মুখে দুর্গন্ধ হবে না।
৩. আরও একটি বিশেষ করণীয় হচ্ছে, জীবাণুনাশক মাউথ ওয়াশ দিয়ে অথবা এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে এক চিমটি লবণ মিশিয়ে মুখ কুলিকুচি করা। তাতে দাঁতের ক্ষয় রোগ ও মাড়ির রোগ বেশিরভাগই প্রতিরোধ করা যায়।
৪. বাঁকা দাঁতে বেশি ময়লা জমে। তাই দীর্ঘসময় নিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। খাবারের পরে অবশ্যই কুলি করা উচিত। কারণ দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা চর্বি ও শর্করাযুক্ত খাবার দাঁতকে দ্রুত ক্ষয় করে ও দাঁতের মসৃণতা নষ্ট করে।
৫. দাঁত ব্রাশ করার সময় জিহ্বা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। টাং স্ক্রেপার অথবা ব্রাশ দিয়েই আস্তে আস্তে জিহ্বা পরিষ্কার করতে হবে।
৬. শরীরের মত মানুষের দাঁত-মুখেরও ব্যায়াম আছে। জাইলোকল জাতীয় চুইংগাম খেলে দাঁত ও মুখের মাসেলের ব্যায়াম হয়।
৭. টুথপিক ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। টুথপিক ব্যবহারে মাড়িতে ইনফেকশন হতে পারে। এ ছাড়া কয়লা, ছাই, মাটি, গাছের ডাল ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।
৮. পান, তামাক, জর্দা খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে, যা দাঁতের স্বাস্থের জন্য ভালো নয়। অনেক সময় মুখে ঘা, ক্ষত বা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে এগুলো। তাই এগুলো বাদ দিতে হবে।
৯. ধূমপান করা থেকে বিরত থাকুন। সিগারেটে থাকা নিকোটিনের প্রভাবে দাঁতের অ্যানামেল ক্ষয় হতে থাকে। এতে দাঁতে কালো দাগ তৈরি হয়।

১০. দাঁতে বা মুখের ভেতরে যেকোনো সমস্যা হলে অবহেলা করা উচিত নয়। মুখের ভেতর কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে (যেমন- ঘা, লাম্প ইত্যাদি) অতি দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।
১১. প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার ডেন্টিস্টের কাছে গিয়ে মুখ ও দাঁতের পরীক্ষা করাবেন। বছরে দু’বার পরীক্ষার ফলে আপনার দাঁত থাকবে সুরক্ষিত ও মজবুত।

দাঁতের যত্নে খাবারঃ
দাঁতের সুস্বাস্থ্যের জন্য যত্নের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় খাদ্যের। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, আয়োডিন, ফ্লোরিন ইত্যাদি দাঁতের জন্য অপরিহার্য। আর তা খাবারের মাধ্যমেই পূরণ করতে হয়।
১. ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবার: ক্যালসিয়াম দাঁত ও মাড়িকে মজবুত করে। যেমন- দুধ, দই, পনির, কাঁটাযুক্ত ছোট মাছ, সয়াবিন, শিমের বিচি।
২. ভিটামিন সি জাতীয় খাবার: এগুলো মাড়ি থেকে রক্তপাত হওয়া কমাতে সাহায্য করে। যেমন- আমলকি, পেয়ারা, লেবুজাতীয় ফল, মাল্টা, টমেটো, কাঁচা মরিচ।
৩. আয়োডিনযুক্ত খাবার: আয়োডিনযুক্ত খাবার হচ্ছে- বাঁধাকপি, ফুলকপি, সামুদ্রিক মাছ ও আয়োডিনযুক্ত লবণ।
৪. ভিটামিন বি১ জাতীয় খাবার: এগুলো দাঁতের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। যেমন- আটা, ডিমের কুসুম, মাছ, চিনাবাদাম।
দাঁতের সঠিক যত্নে আরও কিছু করণীয় বিষয়ঃ
১. আপনার টুথ ব্রাশ প্রতি তিন মাস পর পর বদলান।
২. প্রতিদিন দুধ পান করার চেষ্টা করুন, এটি আপনার ক্যালসিয়াম বাড়ায়। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত করতে সাহায্য করে।
৩. টুথব্রাশ এমন হতে হবে যেন সহজেই তা gumline এর দিকে বাঁকানো যায়। একটি ছোট বৃত্তাকার গতিতে আপনার দাঁতের ভেতরে, বাইরে, উপরে এবং GUM লাইনের নিচে ব্রাশ করুন। কোমল পানীয় পান করার অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং চিনিযুক্ত খাবার আপনার দাঁত থেকে দূরে রাখুন।
৪. খুব শক্ত ব্রাশ আপনার মাড়িতে আঘাত করে রক্ত ঝড়াতে পারে আর খুব নরম ব্রাশ প্লাক দূর করতে পারে না। তাই মাঝারি ধরনের ব্রাশ ব্যবহার করুন।
৫. যখন আপনার সামনের দাঁতের ভেতর পাশ ব্রাশ করবেন, প্রথমে টুথব্রাশকে আপনার দাঁতের ডান পাশের উপর রাখুন। এরপর ব্রাশ নিচে এবং উপরের দিকে সরিয়ে প্রতিটি দাঁত ব্রাশ করবেন। এই পদ্ধতি প্রতিটি দাঁতের জন্য বেশ কয়েকবার করে করুন।

৬. দাঁত ব্রাশ করার পরে মুখে মাউথওয়াশ ব্যবহার করুন।
৭. আপনার জিহবা ব্রাশ করতে ভুলবেন না, সেই সাথে আপনার মুখের উপরের তালু।
ব্যাকটেরিয়া আমাদের একটা অংশ, এটা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।প্রত্যেকের মুখেই লক্ষ লক্ষ ব্যাকটেরিয়া জন্মায়, যার কোন উদ্দেশ্য নেই। এটি দাঁতের পৃষ্ঠের চারপাশে নিজেদের স্থান করে নেয় এবং আমাদের দাঁতে “প্লাক” সৃষ্টি করে অদৃশ্য ভাবে আমাদের দাঁত ক্ষয় করতে থাকে। এটা খুব স্বয়ংক্রিয়ভাবে এবং দ্রুত ঘটে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনার জিহবা আপনার দাঁতের উপর চালালেই এই অনুভূতি অনুভব করতে পারবেন। তাই অবহেলা না করে সঠিক ভাবে দাঁতের যত্ন নিন। দাঁতের সঠিক যত্নে এই কাজগুলো করুন, আশা করি সুস্থ থাকবে আপনার দাঁত।

পূর্ববর্তী পড়ুন

অশোধিত তেল উত্তোলন: তুরস্ক আলোচনায় রাজি হলেও গ্রিসের না

পরবর্তী পড়ুন

বন্ধ হওয়া ভিসা সার্ভিস ফের চালু করলো নেপাল

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 − six =

সর্বাধিক পঠিত